মতপ্রকাশের স্বাধীনতা: বৈশ্বিক অঙ্গীকার, স্থানীয় বাস্তবতা
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানবাধিকারের সর্বজনস্বীকৃত ভিত্তিগুলোর একটি। জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (UDHR)–এর ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—প্রত্যেক মানুষের মতামত ও প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। একই কথা বলা হয়েছে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (ICCPR)–এ, যার স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। অথচ বাস্তব চিত্র প্রায়ই এই অঙ্গীকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি এক টেলিভিশন টকশোতে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে মতপ্রকাশের জেরে এক যুবকের অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ সেই উদ্বেগজনক বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মতামত দেওয়ার অপরাধে তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নির্যাতন করা হয় এবং হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত অচেতন অবস্থায় তাকে ফেলে রেখে যাওয়া হয়—যেন মত প্রকাশের মূল্য তার জীবন দিয়েই দিতে হতো।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন ঘটনা নতুন নয়। মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে ভিন্নমত দমনের জন্য অপহরণ, গুম কিংবা নির্যাতনের অভিযোগ উঠে আসছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করে বলছে—মতপ্রকাশ দমন একটি রাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদী পথে ঠেলে দেয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেখানে প্রশ্ন করার অধিকার হারিয়ে যায়, সেখানে গণতন্ত্র কেবল নামে টিকে থাকে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল চেতনার মধ্যেই ছিল বাকস্বাধীনতা ও ন্যায়ের দাবি। অথচ আজ যদি একজন নাগরিক টেলিভিশনের পর্দায় শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশের জন্য জীবন নিয়ে শঙ্কায় থাকেন, তবে তা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
আরও গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো—অভিযোগ অনুযায়ী হামলাকারীরা নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহার মানবাধিকারের সবচেয়ে গুরুতর লঙ্ঘনগুলোর একটি। যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তবে তা শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের দায়িত্ব দ্বিমুখী। একদিকে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তদন্ত নিশ্চিত করা; অন্যদিকে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে ভিন্নমত ভয় নয়, যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা হয়। কারণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন মানে শুধু একটি কণ্ঠ স্তব্ধ করা নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তার দরজাও বন্ধ করে দেওয়া।
বিশ্ব আজ নজর রাখছে—কে মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়ায়, আর কে নীরবতা বেছে নেয়। এই ঘটনায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা শুধু একজন ভুক্তভোগীর জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি ও আন্তর্জাতিক মর্যাদার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোনো পশ্চিমা ধারণা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। প্রশ্ন হলো—আমরা কি সেই অধিকার রক্ষার সাহস দেখাতে পারছি?


