একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নাগরিকের মৌলিক অধিকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই অধিকারই আজ অনেক ক্ষেত্রে ভয়, নির্যাতন ও মৃত্যুঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সম্প্রতি এক টেলিভিশন টকশোতে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে মতামত প্রকাশের জেরে মোঃ জাকির হোসেন (হিমেল) নামক এক যুবকের ওপর সংঘটিত অপহরণ ও নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ আমাদের সেই কঠিন বাস্তবতাই আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
ভুক্তভোগীর বক্তব্য অনুযায়ী, কেবল একটি মতামত উপস্থাপনের কারণেই তাকে পরিকল্পিতভাবে তুলে নেওয়া হয়, চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয় এবং হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। তাকে প্রশ্ন করা হয়—কেন তিনি নির্দিষ্ট একটি মতাদর্শ বা গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত নন, কেন তিনি সংখ্যালঘুদের পক্ষে কথা বলেন। অর্থাৎ অপরাধ একটাই—তিনি স্বাধীনভাবে চিন্তা করেছেন, কথা বলেছেন।
এ ধরনের ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর হামলা নয়; এটি সমাজের সামগ্রিক চিন্তা ও বিবেকের ওপর আঘাত। যখন মতের ভিন্নতার কারণে কাউকে জীবন-মরণের মুখে দাঁড় করানো হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমরা কোন পথে এগোচ্ছি? ভয় ও শক্তির দাপটে কি যুক্তি, সহনশীলতা ও মানবিকতা হারিয়ে যাচ্ছে?
আরও উদ্বেগজনক হলো, হামলাকারীরা নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে অপহরণ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদি সত্যিই কেউ এই পরিচয়কে অপব্যবহার করে থাকে, তবে তা রাষ্ট্র ও আইনের প্রতি মানুষের আস্থাকে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অন্যদিকে, ভুক্তভোগীকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে যাওয়ার অভিযোগ মানবিকতার চরম অবক্ষয়ের দৃষ্টান্ত।
এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু সংবিধানের পাতায় লেখা একটি বাক্য নয়, এটি বাস্তবে রক্ষা করা না গেলে গণতন্ত্র অর্থহীন হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু অপরাধের পর চিকিৎসা দেওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং মতের ভিন্নতার কারণে যেন কেউ নিপীড়নের শিকার না হয়, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই প্রকৃত দায়িত্ব।
আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—এই ঘটনার নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত জরুরি। দোষীরা যে পরিচয়েই হোক, তাদের আইনের আওতায় আনতেই হবে। একই সঙ্গে সমাজকেও আত্মসমালোচনা করতে হবে—আমরা কি ভিন্ন মতকে সহ্য করার মানসিকতা হারাচ্ছি?
মতপ্রকাশ অপরাধ নয়। এটি দমন করা হলে কণ্ঠরোধ শুধু একজনের নয়, পুরো জাতিরই হয়।


